ইন্টারনেট ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক: কিভাবে হয়? করণীয় কি?

বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যাংকিং হ্যাকের ঘটনা অহরহ হচ্ছে। কষ্টার্জিত অর্থগুলো কিছু অর্থলোভী হ্যাকার নামের অমানুষ ডিজিটাল চুরি করে নিয়ে নিচ্ছে। ব্যাংকে ধর্না দিয়েও তার কোন সুরাহা হচ্ছেনা। বর্তমানে অহরহই ঘটছে এগুলা। তাই আসুন আজকে জেনে নেই কিভাবে এটা হয় এবং কিভাবে তা থেকে মুক্ত থাকবেন।
হ্যাকে কারা জড়িত?
বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিপোর্ট দেখলে আমরা দেখি এখানে অনেক সময় ব্যাংকের কোন কর্মচারী জড়িত অথবা তারা জড়িত না বরং একাউন্ট হোল্ডারের অসতর্কতার কারণেই সেটা ঘটেছে। 
এবং আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি বেশিরভাগ একাউন্টই গ্রাহকের অসতর্কতার কারণেই ঘটেছে। যদিও গ্রাহক একাউন্ট হ্যাক হবার পর সেটা ব্যাংক কর্মচারীর উপর সন্দেহ করে থাকে।
তাই কিভাবে একাউন্ট হ্যাক হয় সেটা জেনে আমরা সতর্ক হই। প্রযুক্তির সুবিধার কারণে আমরা উপকৃত হচ্ছি ঠিকি। কিছু ঘটনার কারণে যেন আমাদের সে সুবিধাটা বন্ধ না হয়।
ব্যাংক কর্মচারী কিভাবে জড়িত? 
হা এটা একটা প্রশ্ন সবার। আপনার একাউন্ট হ্যাক দুশ্রেণীর মানুষ ছাড়া করা সম্ভব না ১. আপনার খুবই কাছের কেউ যে আপনার ব্যাংক একাউন্ট ই-মেইল এবং মোবাইল নং জানে। অথবা ব্যাংকের কোন কর্মচারী যার কাছে আপনার ডাটা রয়েছে। কারণ ব্যাংক কর্মচারী আপনার ব্যাংকের ব্যালেন্স, একাউন্ট সংশ্লিষ্ট মোবাইল নং এবং ইমেইল খুব সহজেই জানতে পারে।
কিভাবে হ্যাক করে একটি ব্যাংক একাউন্ট?
আমরা ব্রাক ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং টা নিয়েই পর্যালোচনা করি। কিছুদিন আগেও শুধুমাত্র মেইল একাউন্ট হ্যাক করেই ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা চুরি করতে পারত। কিন্তু একের পর এক রকম ঘটনা ঘটার পর গ্রাহকদের চাপে ব্রাক ব্যাংক তাদের সিস্টেমে বেশ কিছু রদবদল করে। যার ফলে হ্যাকিংটা একটু কঠিন হয়ে যায়। ব্রাক ব্যাংকে যখন আপনি একাউন্টে লগইন করবেন তখন আপনার মোবাইল এবং মেইলে OTP ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড আসবে। তেমনি যদি কোন বেনিফিশিয়ারী একাউন্ট যোগ করেন তখনো কিন্তু পাসওয়ার্ড দিবে। তাই ব্রাক ব্যাংকের কোন একাউন্ট হ্যাক করতে হলে হ্যাকারকে মোবাইল এবং ইমেইল দুটিই তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। মুলত বর্তমানে মোবাইল সিমটাই হলো একজন গ্রাহকের মুল নিয়ন্ত্রক। তাই হ্যাকার যে কোন উপায়ে আগে মোবাইল সীমটি তার করায়ত্বে নিয়ে আসে।
কারণ মোবাইল সীম তুলতে পারলে ইমেইল এর পাসওয়ার্ড নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারে।
কিভাবে মোবাইল সীম হ্যাকার নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে আসে? 
আসলে বাংলাদেশের মোবাইল প্রোভাইডারগুলো খুবই দায়ীত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছে সরকারী তত্বাবধানের অভাবে। বাংলাদেশে যেভাবে পথে-ঘাটে সীম বিক্রি হয় ৫০-১০০ টাকায় সেটা বোধহয় বিশ্বের আর কোথাও হয়না। কোন রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই যে কেউ সীম নিয়ে নিতে পারে। পরে সেগুলা দিয়ে অপরাধ করেও ধরা ছোয়ার বাইরে চলে যায়। তেমনি একজনের সীম আরেকজনে তুলে নেয় খুব সহজেই।
একটি মোবাইল সীম যদি আপনি তুলতে যান কিছুই লাগেনা। শুধু আপনি লাষ্ট কত টাকা ইন করেছেন আর কার সাথে শেষ কথা বলেছেন এটা বলতে পারলেই যে কোন সীম তোলার পয়েন্ট থেকে আপনি আরেকজনের সীমটি তুলে ফেলতে পারেন।
হ্যাকাররা সীম তোলার জন্য মুলত কি করে?
একজন হ্যাকার যখন আরেকজনের সীম তোলার চেষ্টা করে তখন সে প্রথমে টার্গেটকৃত সীমে ২০-৫০ টাকা ফ্লেক্সিলোড করে থাকে। ফ্লেক্সি করার পর সে বার বার ফোন করে টার্গেটকৃত সীমে যে আমি ভুলে আপনার মোবাইলে টাকা লোড করে দিছি আমাকে আমার টাকাটা ফেরত দিন। আসলে এসব জাষ্ট বাহানা। এটা মুলত সে সীমটি তোলার জন্যই করেছে। এরপর সে যেখনে সীম রিপ্লেসমেন্ট করার জায়গা সেখানে গিয়ে বলে আমার সীমটি হারিয়ে গেছে এটা তুলতে হবে। তখন যে সীম দিবে তিনি কয়েকটি প্রশ্ন করেন। ১. আপনার সীম নম্বর বলেন, ২. এটাতে লাষ্ট কত ডিপোজিট করেছেন ৩. লাষ্ট কত নাম্বারে কথা বলেছেন। ৪. আপনার FnF নাম্বার বলেন। প্রায় জায়গাতেই দুটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেই সীমটি দিয়ে দেয়। আর অনেক ক্ষেত্রে FnF নাম্বার বলতে না পারলে সীম দেয়না তখন সে আবার আরেক পয়েন্টে ট্রাই করে থাকে। যদি একান্তই না পারে তখন আরেকটি ট্রিক্স ব্যবহার করে থাকে।
Fnf নং জানার অভিনব উপায়:
হা যদি কোন কারণে সে FnF নাম্বার ছাড়া সীমটি তুলতে না পারে তারপর সে করে এক চালাকি। টার্গেটকৃত নাম্বারটিতে সে ফোন দিয়ে বলে.
হ্যালো আমি সীম রিপ্লেসমেন্ট সেন্টার থেকে বলছি। একজন আপনার কাছে থাকা সীমটির মালিকানা দাবী করেছে। এখন সীমটি যে আপনার সেটা যদি আপনি প্রুফ করতে পারেন তাহলে তাকে সীমটা দিবনা বরং তাকে আইনপ্রয়োগকারীদের হাতে তুলে দিব। দয়া করে আপনি আপনার FnF নাম্বারটি বলেন। তখন আসল মালিক সরল বিশ্বাসে প্রতারককে FnF নাম্বারটি বলে দেয়। এভাবে সে এবার সীম রিপ্লেসমেন্ট সেন্টারে গিয়ে সীমটি তুলে নেয়। আমার পরিচিত একজনকে এভাবে ফোন করলে উনি পাল্টা প্রশ্ন করেন তাহলে এককাজ করেন আমার তিনটি এফএনএফের ১ টি আপনি বলুন বাকি দুটা আমি বলি। সে প্রতারক তখন ১ টি বলতে না পারার কারণে উনি শিউর হন যে সে আসলে কাষ্টমার কেয়ারের কেউ নন।
যাক সীম তো তোলা হয়ে গেল এবার কি করে সে?
সীমটি তোলা হয়ে গেলে এবার তার টার্গেট মেইল একাউন্ট হ্যাক করা বর্তমানে প্রায় ইউজারই নিরাপত্তার স্বার্থে মোবাইল ভেরিফিকেশন করে রাখেন। পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করতে হলে অবশ্যই অবশ্যই তার মোবাইলে কোড আসবে। সে কোড ব্যবহার করেই ই-মেইল এ লগইন করা যাবে। আর ই-মেইলে লগইন করে সে আইডি পাসোয়ার্ড দিয়ে অনলাইন ব্যাংকিংয়ে ইন করে থাকে যদি তার ব্যাংকিং পাসোয়ার্ড টা জানা থাকে।
আমার ইন্টারনেট ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড তো কেউ জানেনা তাহলে কিভাবে হ্যাক করল?
হা এটার দুভাবে হতে পারে। হ্যাকার কোন ক্রমে পাসোয়ার্ড বের করেছে। সেটা হয় কয়েকভাবে
** Forgot Password সেকশনে গিয়ে রিসেটের আবেদন করে।
** আপনি ইমেইলে পাসোয়ার্ড সেভ করে রেখেছেন
** হ্যাকার কি লগার (Key Logger)  দিয়ে আপনার পাসোয়ার্ড নিয়ে নিয়েছে
** ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার সহায়তায় আপনার পাসোয়ার্ড চেঞ্জ করে নিয়েছে
ব্যাংকের কর্মকর্তার সহায়তায় কিভাবে পাসোয়ার্ড চেঞ্জ করে?
হ্যাকার যদি আপনার ইন্টারন্টে ব্যাংকিং লগইন পাসওয়ার্ড না জানে তাহলে সেটা করার জন্য মেইল থেকে ব্যাংকের সাপোর্টে পাসওয়ার্ড চেঞ্জের এপ্লিকেশন করবে। আর ব্যাংক খুব সহজেই পাসোয়ার্ড চেঞ্জ করে দেয়না। আপনাকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরই পাসোয়ার্ড রিসেট দিবে। এখন আপনার ব্যাংকে দেয়া সব তথ্যের উত্তর কিন্তু যে কেউ দিতে পারবেনা। হয়ত কোন অসত ব্যাংক কর্মকর্তার সহযোগীতায়ই সেগুলা হ্যাকারের হাতে গিয়ে পৌছে। 
ঘরের ইদুর বেড়া কাটলে করার কিছুই নাই। কারণ আমরা আমাদের কর্ষ্টাজিত অর্থ ব্যাংকের কাছে বিশ্বাসের উপরই দিয়ে থাকি। এখন ব্যাংক যদি বিশ্বাস ভংগ করে তাহলে করার কি আছে? আইনগত ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া তো আর উপায় নেই। বেশিরভাগ হ্যাকিং ই ব্যাংক কর্মচারীর সহযোগীতায়ই হয়ে থাকে।
হ্যাক থেকে নিরাপদ থাকার জন্য করণীয় কি?
** আপনার মোবাইল সীমটিকে আগে প্রটেক্ট করুন। কাষ্টমার কেয়ারে গিয়ে তাদের বলে রাখুন আপনার সীমটা যেন সহজে তোলা না যায়। অল্টারনেট মোবাইল নং দিয়ে রাখুন যে এটা তুলতে হলে আপনার অল্টারনেট মোবাইল নিয়ে যেতে হবে।
** কখনো হঠাত অনাকাংখিত লোড চলে আসলে খুশি না হয়ে সাথে সাথে কাষ্টমার কেয়ারে ফোন করে সেটা জানান। 
** কখনো ই-মেইল বা মোবাইল হ্যাক হলে সাথে সাথে ব্যাংকে ফোন করে একাউন্ট লক করে দিতে বলুন।
** আপনার FNF নং কাউকেই বলবেননা। এমনকি যদি বলে কাষ্টমার কেয়ার থেকে বলছি তখনো না।
সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনার পরিচিত মোবাইল এবং ইমেইল অনলাইন ব্যাংকিংয়ে ব্যবহার না করেন। সেটা যদি না করেন তাহলে ব্যাংক কর্মকর্তার সহযোগীতা ছাড়া নরমাল হ্যাকার আপনার অনলাইন ব্যাংকিংয়ে লগইন করতে পারবেনা।
তারপরো প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে হ্যাকাররাও তত আধুনিক চুরিবিদ্যা বের করছে।
তাই আমাদেরো সতর্ক থাকতে হবে। না হয় নিজের কষ্টের টাকাটা নিয়ে নিবে হ্যাকাররা।
শুভকামণা রইল সবার জন্য সবাই ভাল থাকুন।

Comments

comments

3 comments for “ইন্টারনেট ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক: কিভাবে হয়? করণীয় কি?

  1. Mahbub Sumon
    December 5, 2013 at 8:38 pm

    ধন্যবাদ সাদী ভাই, এটা একটা বেশ উপকারী আর্টিক্যাল।

  2. December 7, 2013 at 10:21 pm

    via thanks……………….

  3. Tanvir Ahmed Forex Cyclone
    December 14, 2013 at 4:40 pm

    আমি মনে করি এর জন্য আলাদা একটা সিম ব্যবহার করা ।। যে নাম্বার কেউ জানবে না ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *